সাহিত্য



নীলমানুষ ǁ মৌসুমী মণ্ডল দেবনাথ

Logo

নীলমানুষ

নীলমানুষ ǁ মৌসুমী মণ্ডল দেবনাথ

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক 2018-04-05 11:46:52

দিদি এখানেই নেমে সেরে নিন, বল্লো বাস কন্ডাক্টর।
ঋতুজা জানালার বাইরে তাকালো, যতোদূর দেখা যায় কুয়াশায় ঢাকা মেঘমন্দ্রিত সুবিস্তৃত সুন্দরী গারো হিলস্।  

তলপেটটা আবার কামড়ে উঠলো।
নাহ্ কিছু করার নেই। এখানেই বাস কন্ডাক্টারের কথা মতো ওপেন টয়লেটে মানে রাস্তার পাশেই কাজটা সেরে নিতে হবে। বাস থেকে নামার সময়ে ড্রাইভার বলে উঠলো বেশি দূরে যাবেন না দিদি। পিছনের টার্নিংয়ে চলে যান। তাড়াতাড়ি করবেন।

ঋতুজা পিছনের টার্নিংয়ের দিকে যেতে লাগলো। হাতে এক বোতল টলমলে মিনারেল ওয়াটার আর কাঁধে ক্রিসক্রস ব্যাগ নিয়ে এগুচ্ছে। বাইরে অন্ধকার ছেয়ে আছে গাঢ় সবুজ পাইনের জঙ্গলে। কখনো কখনো শুকনো পাইনের কোণ পতনের আর শুকনো পাতার মর্মর শব্দ। হু হু করে কনকনে ঠাণ্ডা অস্থিমজ্জা ভেদ করে ঢুকতে লাগলো শরীরে। একবার পিছন ঘুরে দেখলো বাসটা দেখা যাচ্ছে কিনা। নাহ্ দেখা যাচ্ছেনা। গায়ের পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে একটার পর একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। প্রায় সব গাড়িরই গন্তব্যস্থল কাছাড়ের শিলচর বা ত্রিপুরার ধর্মনগর। গাড়িগুলোর বেশিরভাগ জানালাই ঠাণ্ডার জন্যে বন্ধ। তাই খানিকটা নিশ্চিন্তে একটা সাইড ধরে বসে পড়লো ঋতুজা। এসব ক্ষেত্রে লজ্জা করে লাভ নেই।

জোয়াই রোডের কাছে একটা দোকানে ভেড়ার মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছিলো। লোভ করে একটু সিদল শুটকি মাছের চাটনি খেয়েই এই বিপত্তি। থেকে থেকেই পেট কামড়ে উঠছে। ব্যাগে O2 অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, ওআরএস ছিলো। খেয়েও নিলো।

কাজ শেষ করে বাসটা যেখানে দাঁড়িয়েছিলো সেখানে গিয়ে আঁতকে উঠলো ঋতুজা। বাসটা কোথায় গেলো? এপাশ ওপাশ কোত্থাও বাসটা নেই। আরে! রাস্তার ধারে রুকস্যাক্ ব্যাগ আর ট্রলি স্যুটকেসটা ফেলে দিয়ে গেছে। এখন কি করবে ঋতুজা? এই জনমানবহীন নির্জন পাহাড়ি পথে একা একা কি করে ম্যানেজ করবে কোনও গাড়ি? লোকগুলো এত্তো সেন্সলেস নিষ্ঠুর হয় কি করে! একা একটা মেয়েকে ফেলে চলে গেলো! এসব ভেবেচিন্তে আর কোনও লাভ নেই বুঝলো সে। চলন্ত গাড়িগুলোকে লিফট দেয়ার জন্যে চেষ্টা করতে লাগলো ঋতুজা, কিন্তু একটা গাড়িও থামছেনা। এখন ওর হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আর কোনও গাড়িও আসছেনা। রাত গভীর হচ্ছে কুয়াশা পায়ে। ব্যাঙ্গালুরুতে চাকুরিরতা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সাহসী আধুনিক ট্র্যান্সজেন্ডার মেয়ে ঋতুজা কি একটু দুর্বল হয়ে পড়লো তাহলে? নাহ্, তাহলে কি করে হবে। এইভাবে দাঁড়িয়ে থেকেও তো কোনও লাভ নেই ভাবছে ঋতুজা।

সেক্স চেঞ্জ করার জন্যে নিজের পরিবারের ভালোবাসা থেকে সে বঞ্চিত অনেকদিন। সমাজের সো কল্ড 'নর্মাল' মানুষদের সাথে ক্রমাগত স্নায়ু যুদ্ধ করতে করতে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছে। এদেশের সভ্য মানুষেরা এখনও ওর মতো ট্র্যান্সজেন্ডার মানুষদেরকে অসম্মানের চোখেই দেখে, মুখটিপে হাসে। বাসের কন্ডাক্টর, ড্রাইভার আর যাত্রীদের অসহজ চোরাহাসি তার নজর এড়ায়নি।

তার এই ঋতুপর্ণ থেকে ঋতুজা হওয়ার পথটি সরলরেখায় চলেনি। আশৈশব তার শরীর আর মনের চতুষ্কোণে জুটেছে অন্ধকার আর যৌন শোষণ। যখন ওর চৌদ্দ বছর বয়স, একদিন চৈত্রের দুপুরে দিদির ম্যাক্সি পরে আয়নায় নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলো মনে মনে মেয়ে, ঋতু। বাড়ির সবাই গেছে গড়িয়াহাটে চৈত্র সেলের কেনাকাটা করতে। একলা বাড়িতে তার ঘরে পা টিপে টিপে ঢুকলো কাকাই। সেই শুরু, তারপর থেকে স্কুল, কলেজ সব জায়গায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে যাপন।

অনেক কষ্টের মধ্যেও ঋতু ভালো রেজাল্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলো। অবশেষে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে একটা আমেরিকান কোম্পানিতে ভালো চাকরিও পেলো। পেলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। না কলকাতার মতো ব্যাঙ্গালুরু তার দিক থেকে মুখ ঘোরায়নি। ওখানকার কলিগ বন্ধুরা ওর পাশে দাঁড়িয়েছে। সাহায্য করেছে ঋতুপর্ণ থেকে সেক্স চেঞ্জ করে ঋতুজা হতে। একদিন আলসোর লেকের ধারে বেড়াতে গিয়ে প্রিয় বন্ধু শ্রীতমা বল্লো, " ঋতু এখন তো শুধু তোর অর্গানগুলোই চেঞ্জ হয়েছে রে, তুই তো মনে প্রাণে মানবী জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই। তোর এই মেয়ে হওয়ার মধ্য দিয়ে তুই আমাদের মেয়েজন্মকেই শ্রদ্ধা জানালি।"
 
এমন করে স্নেহময় কথা অনেক বছর ঋতুজা শোনেনি। আজ এই যে তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে এক বাসভর্তি লোক চলে গেলো, এই ঘটনাটা কিসের ইঙ্গিত করে?

অনেক বছর পরে ঋতু বাড়ি যাচ্ছে মায়ের ডাক পেয়ে। এ'টুকুতে যেন তার পৃথিবী জয় হলো। সেদিন জোছনায় তার বাগানের হাসনাহেনারা একজন আরেকজনের উপরে আহ্লাদে গলে পড়লো। স্বর্ণলতারা যেন তাদের হলুদবর্ণ নিয়ে ঋতুজাকে প্রাণ দিলো। আজ আর এই মানুষগুলোর এমনতরো অসভ্য আচরণে সে অবাক হলোনা।

কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা জঙ্গলের দিক থেকে একটা শিষের তীক্ষ্ণ আওয়াজ অনেকক্ষণ ধরে আসছে। মেঘালয়ের পর্বতমালাগুলো অনিন্দ্য সুন্দর। যেদিকে চোখ যায় অজস্র নাম না জানা ফুলের রঙিন বাসর গারো হিলসের যৌবন ধরে রেখেছে। চেনা অচেনা পাখিদের ভীড় আচ্ছন্ন করে রেখেছে বৃক্ষদের। পাখিরা তাদের গৃহস্থালীতে নক্ষত্রের লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে। শিশির পান করায় সন্তানদের। পৃথিবীতে পাখিরা মানুষদেরকে ত্যাগ করছে এখন এই দহনের দিনে। ওরা আর মৃত জনপদে থাকতে চায়না। অভিমানে যেতে চাইছে ঘন অরণ্যের আড়ালে। আমরা ওদের সাথে প্রতিনিয়ত বিশ্বাসঘাতকতা করে যাচ্ছি। এখানে এই যূথ বৃক্ষরাজিকে এরা বেসেছে ভালো। 
হঠাৎ বৃষ্টি এলো।  
মেঘালয়ে এই ইলশেগুঁড়ি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি একটা মিস্টি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, যখন তখন হতেই পারে। আর ছুঁয়ে দিতেই পারে লুকিয়ে রাখা জেজাবেন প্রজাপতির রঙধনু পাখা, অপরাজিতা মেঘমল্লারের গানের আসর।
মৃদু ত্বক ছোঁয়া বৃষ্টিকণায় ভিজিয়ে নিচ্ছে গা ঋতুজা। রবি ঠাকুরের গানটা মনে এলো, 
"একি লাবণ্যে পুণ্য প্রাণ, প্রাণেশ হে। আনন্দ বসন্ত সমাগমে। বিকশিত স্মৃতি কুসুম হে, আনন্দ বসন্ত সমাগমে।" 
"আহা আজি এ বসন্তে" যদি চিরতরে হারিয়ে যাওয়া যেতো কাঙ্খিত পুরুষের সাথে গারো হিলসের ঘন অরণ্যে। 

যতোক্ষণ না কোনও গাড়ি পায়, ঋতুজা ঠিক করলো হেঁটে হেঁটেই রাস্তা পার করবে। একটা গাড়িরও দেখা নেই। রুকস্যাক্ ব্যাগ আর ট্রলি সুটকেশটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। নির্জন পাহাড়ি রাস্তা। একদিকে খাঁড়া পাহাড় আর অন্যদিকে অতল অন্ধকার খাদ। এক পা এদিক সেদিক হলেই অবধারিত শীতল নীল মৃত্যু। আর মরলেই বা কি? ও মরলে কার কি যাবে আসবে? মা আর ব্যাঙ্গালুরুর কয়েকজন দরদী বন্ধু ছাড়া আর কারোর হয়তো মনে দাগও কাটবেনা। 

এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে কখনও কোনো পুরুষ তাকে প্রেম নিবেদন করেনি। ওর গায়ে আর আলো নেই। হেঁটে যেতে যেতে যেন রংসাইডে চলে গেছে জীবন। মাঝেমধ্যে লাল দ্রাক্ষারস নিয়ে এসেছে কোনও কোনও পুরুষ, যা পান করা বিষের সমান। শারীরিক চাহিদা থাকলেও সে এড়িয়ে চলে পুরুষদেরকে। কৈশোর থেকে এতো মানুষ তার সাথে শরীরী খেলা করেছে, সে এখন ভুলেই গেছে অনভূতির ভাঁজগুলোকে। কারা যেন হলুদ ছড়িয়ে দিয়েছে তার আসা যাওয়ার পথে।
 
অথচ তার মুখচোখে যেন রসকলি আঁকা কামনার ছোপ লেগে আছে। দেহরস প্রকট হয়ে বেরিয়ে পড়ছে টিশার্ট, জিনস্ আর ক্লিভেজে। ভীষণ ক্লান্ত সে মাস্ক পরা মানুষগুলোকে দেখে দেখে।

আর যৌনতা চায়না সে। ভুলে যেতে চায় তার সব শ্লীলতাহানির দিনগুলোকে। এখন আর কেউ সাহস পায়না তাকে ছুঁয়ে দেখতে।

আনমনে চলছে রাতের অন্ধকার সাথে নিয়ে। মাঝেমাঝে ঝরে পড়া পাইনের কোণ পায়ে ঠেকছে। উঁবু হয়ে বসে ক'টা পাইনের কোণ কুড়িয়ে ব্যাগে রাখলো। চারদিকে শুধুই পাহাড় আর পাহাড়। কিছু কিছু গাছের গায়ে এখনও রূপোর মতো বরফ কুচি লেগে আছে। জ্যোৎস্না আলস্যে এলিয়ে দিয়েছে গা। ঘন মেঘ আর কুয়াশা নেমে এসেছে কালো চকচকে পিচের রাস্তায়। একটা নাম না জানা রাতপাখি রাতের নিস্তব্ধতার বুক চিরে ক্যাঁ ক্যাঁ করতে করতে মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। গা'টা কেমন ছমছমিয়ে উঠলো ঋতুজার। না সে কোনও অশরীরী কিছুতে বিশ্বাস রাখেনা। বিজ্ঞানে বিশ্বাস করে।

অনেকক্ষণ ধরে যে শিষটা শোনা যাচ্ছিলো জঙ্গল থেকে তা যেন অনেকটা কাছে চলে এসেছে আস্তে আস্তে। হঠাৎই ঋতুজার আশপাশটা আলোকিত হয়ে গেলো। তার সামনে একটা গোল মতো অজানা যান উড়ে এসে সামনে দাঁড়ালো। চারদিকের স্লেটরঙা মেঘ যেন আরও ঘন হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। ঐ অচেনা যানটার গা থেকে লাল, বেগুনি, সবুজ আলো বেরোচ্ছে। আর এই আলোর মধ্য দিয়ে সাদা পোশাক পরা নীল রঙের এক অদ্ভূত নীলরঙা পুরুষ একগুচ্ছ গোলাপী অর্কিড ফুল হাতে ঋতুজার দিকে এগিয়ে আসছে। ঋতু ভয়ে কাঁপছে। একি ভুত নাকি! চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলছে সে। অতঃপর জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। 

চোখ যখন খুল্লো, দেখলো সেই অদ্ভূত যানটার ভিতরে মেজেন্টা আর সাদা ফুল ছড়ানো একটা নরম তুলতুলে বিছানায় সে শুয়ে আছে। শরীরের সব ক্লান্তি কোথায় উধাও হয়ে গেছে। সেই নীলরঙের মানুষটা ওর কপালে খুব চেনা গন্ধওয়ালা একটা সাদা ভেজা রুমাল দিয়ে জলপট্টি দিচ্ছে। রুমালটা ওর খুব চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছে মনে করতে চাইলো। আরে! এটা তো ওর মায়ের সেই রুমালটা যার এককোণে মা একটা নীলকন্ঠি পাখি ফ্যাব্রিক দিয়ে এঁকেছিলো। এই রুমালটাইতো অডিকোলন মেশানো ঠাণ্ডা জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে মা ওর কপালের বিষণ্ণ জ্বরগুলো মুছে দিতো। এই লোকটার কাছে এটা এলো কোথা থেকে? আশ্চর্য তো! 

একটা বেঁটে মতো নীল মানুষ এই প্রথম লোকটার হাতে একটা ডায়েরি দিয়ে গেলো। একি, এটাতো ঋতুরই ডায়েরি। যখন ক্লাস নাইনে পড়তো ঋতু, ওর জন্মদিনে বাবা এটা ওকে প্রেজেন্ট করেছিলো। এটাতে সে তার সব ইচ্ছের কথা লিখতো, কবিতাও লিখতো। একদিন দিদি দেখে ফেলে ডায়েরিটা। তারপরেই ওর মেয়ে হওয়ার ইচ্ছের কথাটা জেনে ফেলে বাবা, মা, বাড়িসুদ্ধ সব মানুষ। বাবা গম্ভীর হয়ে দক্ষিণের ঘরে দাঁড়িয়েছিলো। দিদি বিস্ফোরিত নেত্রে তারদিকে তাকিয়ে আছে। মা আঁচলে চোখ মুছছিলো। কাকাইকে বাবা বল্লো, "ওকে কি শাস্তি দিবি দে। আমি আর দাঁড়াতে পারছিনা। শরীর খারাপ লাগছে।" 

কাকাই ওকে সবার সামনে দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো। এরপর সজোরে আবার সেই পুনরাবৃত্তি। ব্যথায়, লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলো ঋতু। গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছিলোনা। পরিবারের সবার উপস্থিতিতে সে ধর্ষিত হলো। এখানেই শেষ ছিলোনা, কাকাই তার ডায়েরিটা নিয়ে কোথাও ফেলে দিয়ে এসেছিলো। অনেক খুঁজেও সে আর ডায়েরিটা খুঁজে পায়নি।

নীল মানুষটা বলে উঠলো, "ঋতু জো না জি সি পি না। " তারপরে স্পষ্ট বাংলায় বল্লো, " ঋতু তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো। আমরা চারজন এলিয়েন। আমরা 00000,9456789 আলোকবর্ষ দূরের একটা গ্রহে থাকি। আমাদের গ্রহের নাম 'জিটা'। তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা তোমার ডায়েরিতে আঁকা ছবি থেকে কিছু নীলরঙ নিয়েছিলাম বেঁচে থাকার জন্যে। তোমাদের বাড়ির পিছনে কাঠচাঁপা গাছের তলায় তোমার এই ডায়েরি, রুমাল আর এই কোলনের শিশিটা পেয়েছিলাম। আমাদের জীবনীশক্তি থ্রি আউন্স নীল জলে। প্রতি দশ বছরে একবার পৃথিবীতে থ্রি আউন্স নীলরঙ নিতে আসি আমরা। দশ মিনিটের মধ্যে আমাদেরকে নীলরঙ সংগ্রহ করতে হয়। সে বছর অনেক খুঁজেও নীলরঙ পাচ্ছিলাম না। হঠাৎই তোমার ডায়েরিটা খোলা অবস্থায় পেলাম আমরা। এটাতে তুমি যে নীলসমুদ্রের ছবি এঁকেছিলে, সেই পাতা থেকেই আমরা রঙটা পেয়ে যাই। তোমার জন্যে আমরা সবাই প্রাণ ফিরে পেয়েছি। আমাদের কাছে পৃথিবীর ভাষা বোঝার জন্যে ট্র্যান্সলেটর মেশিন আছে। এরমাধ্যমেই আমি তোমার ডায়েরি পড়ে তোমার মনের সব চাওয়া পাওয়ার কথা জানতে পেরেছি। তোমাকে আমি ভালোবাসি ঋতু। আমি 'জিটা' গ্রহের একজন বিজ্ঞানী, আমি মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করছি। শুধু তোমায় কাছে পাওয়ার জন্যে আমি রবীন্দ্র, জীবনানন্দ, সুনীল, কীটস্, শেক্সপীয়র এমনকি শ্রীজাতর সব লেখা পড়েছি। তুমি কি আমায় একটু ভালোবাসবে?"
এতোগুলো কথা একটানা বলার পরে লোকটা থামলো। মনে হয় জানেনা, কথা বলতে হয় থেমে থেমে, একটু নাটক করে, কিছু সত্যি আর মিথ্যে মিশিয়ে। 

ঋতু কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। নীল মানুষটা ওর হাত ধরে ওই যানটার বাইরে এসে দাঁড়ালো। 
বল্লো, "চলো আমার সাথে। ঐ উত্তরের পাহাড়টা পার হলেই সিমসাং নদী। ওখানে বসে কথা বলা যাক। লোকটার গলার স্বরে কেমন স্নেহ জড়ানো। ঋতু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার হাতে হাত রাখলো। পাহাড়ের ধার বেয়ে উঠতে লাগলো তারা। পাইনের ঘন সবুজ জঙ্গলের উপরে তখন পূর্ণশশী জোছনায় ভাসছে মেঘের পালকে। ওই এলিয়েন লোকটার গা বেয়ে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিধারা নামছে। এতো শীতেও ঘামতে লাগলো ঋতুজা। তার ইমপ্ল্যান্ট করা সিলিকন ব্রেস্টে জমে থাকা সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠলো। কি অপরূপ লাগছে এই এলিয়েন পুরুষকে। সে খোলা গলায় গাইছে ঋতুর প্রিয় গান, 
"কেটেছে একেলা বিরহের বেলা, 
আকাশকুসুম-চয়নে।
সব পথ এসে মিলে গেল শেষে 
তোমার দুখানি নয়নে।
দেখিতে দেখিতে নূতন আলোকে
কি দিল রচিয়া ধ্যানের পুলকে
নূতন ভুবন নূতন দ্যুলোকে
মোদের মিলিত নয়নে। "

আহা কি সুন্দর একাত্ত হয়ে গাইছে। এই পূর্ণিমায় কোথায় একটা কোকিল ডেকে গেলো।  

ওরা পৌঁছে গেছে সিমসাং নদীর পাড়ে। এখানে অনেক রকমের লেবু গাছ। জায়গাটা লেবুফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে আছে। একটা গাছ থেকে লোকটা কয়েকটা কমলালেবু পেড়ে এনে দিলো ঋতুকে। বল্লো, "খেয়ে নাও। এখানকার কমলালেবু খুব মিস্টি খেতে।"
ওরা বসলো ঘাসবনে, নদীর ধারে একটা ধূপগাছের তলায়। নক্ষত্রের আলোয় গাছটা থেকে সবুজ পেখম তোলা ধূপফল চরকির মতো ঘুরে ঘুরে পড়ছে পৃথিবীতে। অজস্র নাম না জানা ছোট ছোট ফুল ফুটে আছে চারধারে। 
ঋতু কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে এই এলিয়েনটার উপরে। হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। নীলমানুষটা ঋতুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বল্লো, "কেঁদে নাও মেয়ে, যতোক্ষণ চাও। "
লোকটার বুকের উপরে একটা নীলপদ্ম আঁকা। পদ্ম ফুলের গন্ধ ম ম করছে উরসে। ঠিক এই গন্ধটাই তো সে খুঁজে যাচ্ছে মেয়ে জন্মের প্রথম লগ্ন থেকে। ট্র্যান্সজেন্ডার মেয়ে ঋতুজার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো কিছু অধরা মধুর শব্দ অমৃতের মতো "তোমায় ভালোবাসি প্রিয়।" #

Reply


Write a comment

Sign up