ফিচার



বেনাপোলে হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ি আশ্রম

Logo

ছবি ও ভিডিও: লেখক

বেনাপোলে হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ি আশ্রম

অমিয় দত্ত ভৌমিক 2018-08-30 11:20:04

যশোহর জেলার বেনাপোলে অবস্থিত নামাচার্য্য শ্রী শ্রী ব্রহ্ম হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ী আশ্রম। এটি বৈষ্ণবকুল শিরোমনি শ্রীশ্রী হরিদাস ঠাকুরের ভজন কানন।

প্রতি বছর এখানে হরিদাস ঠাকুরর নির্যাণ তিথি মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

যশোর জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে যশোর-কলকাতা রোডের পাশে বেনাপোলে অবস্থিত শ্রী শ্রী মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের ভক্ত শ্রী শ্রী  ব্রক্ষ হরিদাস ঠাকুরের সাধনপীঠ পাটবাড়ি আশ্রম।

আশ্রমটি ভারত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমারেখা থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরত্বে।

আশ্রম ও বিভিন্ন সুত্রে শ্রীশ্রী হরিদাস ঠাকুর সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানার অন্তর্গত কেড়াগাছি গ্রামে ১৩৭২ শকাব্দে অগ্রাহয়ন মাসে নামাচার্য্য শ্রীশ্রী ব্রহ্ম হরিদাস ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন (শকাব্দ অথবা শালীবাহনাব্দ হলো ভারতীয় উপমহাদেশে বহুলপ্রচলিত এক প্রাচীন সৌর অব্দ। এই অব্দ বঙ্গাব্দের ৫১৫ বছর পূর্বে এবং খ্রিস্টাব্দের ৭৮ বছর পরে প্রচলিত হয়)। তার পিতার নাম সুমতি মিশ্র এবং মাতার নাম গৌরীদেবী।

ঠাকুর হরিদাসের বয়স যখন দু'মাস সেই সময় সুমতি মিশ্র পরলোক গমন করেন। সে সময় বাংলায় সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। প্রথা অনুসারে  গৌরীদেবী স্বামীর চিতায় সহমরন বরণ করেন। ফলে ঠাকুর হরিদাস অনাথ হয়ে যান।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর শিশু হরিদাস ঠাকুরের লালন পালনে কেউ এগিয়ে না এলে সুমতি মিশ্রের প্রজা হাবিবুল্লা কাজী তাঁর দায়িত্ব নেন। হাবিবুল্লা কাজীর স্ত্রীর আদর যত্নে হরিদাস প্রতিপালন হতে থাকেন। এইভাবে যবনের অন্নে যবনের ঘরে প্রতিপালন হবার জন্যই তাঁকে যবন হরিদাস বলা হয়। বাল্যকাল থেকে কৈশোরে পদার্পন করার পর কৃষক হাবিবুল্লা কাজী তাঁকে রাখালের কাজ দেন।

হরিদাস প্রতিদিন তার কাজ শেষ করে এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে বেদ, গীতা, রামায়ন, মহাভারত পাঠ শুনতে যেতেন। পাঠ শুনতে শুনতে তিনি অন্তরে যেন কিসের একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতে থাকেন। তাঁর প্রগাঢ় ঈশ্বর ভক্তি জন্মায়।

অন্তরে ঈশ্বর ভক্তি ও হরিনামে প্রবল অনুরাগ দেখা দিলে তিনি সব সময় উচ্চস্বরে হরিনাম জপ করতে লাগলেন। এভাবে চলতে থাকা অবস্থায় কাজীর দরবারে তাঁর বিরুদ্ধে নালিশ যায়। কাজীর হুকুমে জল্লাদ হরিদাসের পায়ে রশি বেঁধে টানতে টানতে বাইশ বাজারে বেত্রাঘাত করে ঘুরালেও তাঁর হরিনাম বন্ধ করতে পারেন নি।

হরিনামের প্রতি একনিষ্ঠ অবিচল ভক্তি দেখে সকলেই বিস্মিত ও স্থম্ভিত হয়ে পড়েন। বিচারক কাজী সাহেব তার অন্যায় বিচারের অনুতাপ প্রকাশ করে ঠাকুর হরিদাসকে অন্যত্র চলে যেতে অনুরোধ করেন। নিজ গ্রামের পারিপার্শ্বিক প্রতিকুলাবস্থা অনুধাবন করে কোন এক নির্জন নিশিথে ঠাকুর হরিদাস অজানার উদ্দেশ্যে পথে বেড়িয়ে পড়েন। ঘুরতে ঘুরতে ঠাকুর হরিদাস তৎকালীন সময়ের প্রতাপশালী রাজা রামচন্দ্র খাঁর অধীনে গহীনে জঙ্গলে আশ্রয় নিলেন। সেই জঙ্গলাকীর্ণ স্থানটি আজকের বেনাপোলে নামাচার্য্য শ্রীশ্রী ব্রহ্ম হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ী আশ্রম।

এহেন জঙ্গলাকীর্ণ আশ্রমে ঠাকুর হরিদাস যখন হরিনাম জপ সাধনে নিমগ্ন তখন হরিদাস ঠাকুরের প্রতিদিন তিন লক্ষ বার হরিনাম জপের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার সুধাময় কন্ঠের মধুর হরিনামাকর্ষনে দলে দলে ভক্ত ছুটে আসে পর্ণকুঠিরে। পর্ণকুঠির হলো প্রেম কানন। ভক্তের আগমনে সেই জঙ্গলাকীর্ণ আশ্রম পরিনত হলো মহাতীর্থ স্থানে।

অত্যাচারী রাজা রামচন্দ্র খাঁ ঠাকুর হরিদাসের গুনগান সহ্য করতে না পেরে তাঁকে জ্যান্ত পুরিয়ে মারার নির্দেশ দেন। কিন্তু এতে বিফল হয়ে তৎকালীন হীরা নামক এক বারবনিতাকে দিয়ে তার সাধন, ভজন, যশ, খ্যাতি, ধর্ম নাশ করার চক্রান্ত করতে থাকেন। সমস্ত চক্রান্তে ব্যর্থ হয়ে বারবনিতা হীরা হরিনাম মহামন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে হরিদাস ঠাকুরের পরম বৈষ্ণবী হয়ে যান।

নামাচার্য্য শ্রীশ্রী ব্রহ্ম হরিদাস ঠাকুর ছিলেন প্রকৃত বৈষ্ণবের জলন্ত নিদর্শন এবং দৈন্যের অবতার। তিনি হরিনাম করতে করতে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কোলে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এবং মহাপ্রভু নিজ হস্তে পরিষদ বর্গকে সঙ্গে করে পুরীধামে তাঁর সমাধী স্থাপন করেন।

রাজা রাম চন্দ্রের অত্যাচারের সময় গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু পরিষদ বর্গকে সঙ্গে করে এই বেনাপোল আশ্রমে আসেন। কথিত আছে অদ্বৈত মহাপ্রভুর হাতের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রেখে যান যা আজ অবনত মস্তকে দন্ডায়মান সুবৃহৎ তমাল বৃক্ষ।

এখনো রয়েছে সেই মাধবী লতা যেখানে বসে ঠাকুর হরিদাস জীবের মুক্তির লক্ষ্যে দিন-রাত তিন লক্ষ বার নাম যপ করতেন। এই সেই সিদ্ধপীঠ তীর্থভূমি। নামাচার্য্য শ্রী শ্রী ব্রহ্ম হরিদাস ঠাকুরের পাটবাড়ী আশ্রম।#

Reply


Write a comment

Sign up